রাজবন বিহারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানসমূহ

সাধারণত রাজবন বিহারে ভগবান বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত পূর্ণিমাগুলো কম-বেশী পালন করা হয়। তন্মধ্যে অত্যধিক গুরুত্ব ও গৌরবসহকারে নিম্নলিখিত পূর্ণিমা তিথিসমূহ এবং অন্যান্য কিছু ধর্মানুষ্ঠান সর্বজনীনভাবে পালন করা হয়।

১। বৈশাখী পূর্ণিমা : এটি ‘বুদ্ধপূর্ণিমা’ নামেও খ্যাত হয়। ত্রিস্মৃতি বিজরিত শুভ এই পূর্ণিমা তিথি সকল বৌদ্ধদের নিকট একটা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিন। পবিত্র বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে ভগবান বুদ্ধ—

  • লুম্বিনী উদ্যানে ‘জন্মগ্রহণ’ করেন।
  • নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থ বোধিবৃক্ষমূলে ‘বুদ্ধত্ব’ লাভ করেন।
  • কুশীনগরের শালবনে ‘মহাপরিনির্বাণ’ লাভ করেন।

২। আষাঢ়ী পূর্ণিমা : এই পূর্ণিমা তিথির মাহাত্ম্য নিম্নলিখিত কারণে। এই তিথিতে ভগবান বুদ্ধ—

  • তুষিত স্বর্গ হতে এসে মহামায়া দেবীর গর্ভে ‘প্রতিসন্ধি’ গ্রহণ করেন।
  • মহাভিনিষ্ক্রমণ’ করেন (সত্য ও আধ্যাত্মিক মুক্তির সন্ধানে গৃহত্যাগ করেন)।
  • ঋষিপতনের মৃগদায় বনে অনুত্তর ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন’ করেন।
  • শ্রাবস্তী প্রাঙ্গনে অপূর্ব ‘যুগল ঋদ্ধি’ প্রদর্শন করেন।
  • তাবতিংস স্বর্গে ‘বর্ষাবাস যাপন’ করেন।

৩। ভাদ্র পূর্ণিমা : এ পূর্ণিমাটি ‘মধু পূর্ণিমা’ নামেই বেশি সুপরিচিত। পারিলেয়্য বনে ভগবান বুদ্ধের বর্ষাবাস যাপনের সময় পারিলেয়্য নামক মহাহস্তীর ভগবান বুদ্ধকে সেবা করেন। মহাহস্তীর সেবা ব্রত দেখে একটি বানরও অতীব ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহকারে বুদ্ধকে মধু দান করেন। এই দুটি কারণই ‘ভাদ্র পূর্ণিমা’ বা ‘মধু পূর্ণিমা’-এর মাহাত্ম্য।

৪। আশ্বিনী পূর্ণিমা : এই পূর্ণিমা সকলের নিকট ‘প্রবারণা পূর্ণিমা’ নামে অতি পরিচিত। এই দিনে ভগবান বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গে বর্ষাবাস সমাপ্ত করে স্বর্গ হতে সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন এবং ব্রহ্মা-দেব-মনুষ্য-নারকীয় সত্ত্বগণের পরস্পর দর্শনার্থে ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন।

৫। মাঘী পূর্ণিমা : এই পূর্ণিমা তিথিতে ভগবান বুদ্ধ স্বীয় পরিনির্বাণের সময় ঘোষণা করেন।


এছাড়া রাজবন বিহারে সারা বছর বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি বিশেষ গুরুত্বের সাথে উদ্যাপন করা হয়। যেমন:—

১। বনভান্তের জন্মদিন : প্রতি বছর ৮ জানুয়ারি পরম পূজ্য বনভন্তের জন্মদিন জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সর্বজনীনভাবে পালন করা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সাল থেকে বনভান্তের জন্মদিন উদযাপিত হচ্ছে।

২। সীবলী পূজা ও বোধিবৃক্ষ পূজা : প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পূজাদ্বয় অনুষ্ঠিত হয়।

৩। নববর্ষ উদযাপন : এপ্রিল মাসে নববর্ষ হয়ে থাকে। নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ দিনটিতে সর্বজনীনভাবে পরিত্রাণ শ্রবণ এবং বিবিধ দানাদি ধর্মানুষ্ঠান করা হয়।

৪। কঠিন চীবর দান : আশ্বিনী পূর্ণিমার পর প্রতিপদ তিথি হতে কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই এক মাস পর্যন্ত যে-সমস্ত বিহারে কোনো ভিক্ষু বর্ষাবাস যাপন করেন সেখানে কঠিন চীবর দান করা যায়। রাজবন বিহারে ওই এক মাসের মধ্যে সর্বশেষ শুক্রবারটিতে কঠিন চীবর দান উদযাপন করা হয়। রাজবন বিহারের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৮৬ সাল ব্যতীত প্রতি বছরই ‘২৪ ঘন্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা কেটে, বস্ত্র বয়ন ও চীবর সেলাই করার পদ্ধতিতে’ কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে কঠিন চীবর দানের আদ্যোপান্ত নিচে দেয়া হলো:— 

  • প্রথমে তুলা গাছ বা কার্পাস গাছ থেকে তুলা সংগ্রহ করা হয়।
  • এরপর চরকির সাহায্যে কার্পাস থেকে তুলা বের করা হয় এবং ধনুকের সাহায্যে সেই তুলা ধোনা হয়।
  • তুলা ধোনার পর সুতা কাটার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ‘প্যাঁচ’ তৈরি করা হয় এবং তা বের করে সুতা লাঙা (সুতার ফেটি বা গুলি) করা হয়।
  • এরপর সুতা রং করে সিদ্ধ করার পর ব্রাশ করা হয়। 
  • সুতা শুকানোর পর ‘নাথাই’ করা হলে ‘বেইন’ বাঁধা হয়।
  • বেইন বোনা বা কাপড় বোনা শেষ হলে চীবর সেলাই করে অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান করা হয়।

৫। আকাশ প্রদীপ পূজা : কার্তিকী পূর্ণিমা হতে ১ মাস পর্যন্ত এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

৬। মহিলাদের মহাসংঘ দান : প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর মহিলাদের উদ্যোগে ‘মহাসংঘদান’ আয়োজিত করা হয়। 

এছাড়াও মানুষেরা এলাকাভিত্তিক ও গোজাভিত্তিক মহাসংঘদান করে থাকে। যেমন:— শলক এলাকাবাসী কর্তৃক মহাসংঘদান করা ইত্যাদি। অধিকন্তু প্রতিদিনই রাজবন বিহার দেশনালয়ে, বিশেষত শুক্রবারে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে সংঘদান, অষ্ট পরিষ্কার দানাদি ধর্মানুষ্ঠান করা হয়।