রাজবন বিহারের দর্শনীয় স্থান

“বনভন্তে” ও “রাজবন বিহার” এই দুটি অতি পরিচিত ও পবিত্র নাম। এই দুটি নাম উচ্চারণ করেনি এমন ব্যক্তি অত্র পার্বত্য এলাকায় অতি নগন্য। পূজ্য বনভন্তের পদাচরণভূমি রাজবন বিহার শুধু একটি বিহারের নাম বা স্থান নয়; এর পেছনে সত্যধর্ম উপলব্ধিকারী একজন মহাপুরুষ “বনভান্তে”-এর আধ্যাত্মিক শক্তির অসীম প্রভাব রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চল হতে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এবং আশীর্বাদ প্রাপ্তির প্রত্যাশায় শ্রদ্ধেয় বনভান্তের নিকট প্রতিদিন বহু মানুষের আগমন হয়। তাছাড়া রাজবন বিহার একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে বাংলাদেশের বুকে অনেক আগেই ঠাঁই পেয়েছে। সারা বছর কাছের ও দূরের বহু পর্যটকদেরও অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে এই রাজবন বিহার। তবে, বিশেষত সকলের এই বিষয়টি মনে রাখা উচিত, রাজবন বিহার দর্শনীয় স্থান হিসেবে যতই খ্যাত হোক না কেন, এটি কোনো পর্যটন কেন্দ্র নয়; রাজবন বিহার হলো পরম পূজ্য বনভান্তের পদাচরণায় মুখরিত একটি বৌদ্ধ তীর্থভূমি, একটি বৌদ্ধধর্মীয় বিহার। সুতরাং একটি বিহারের ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য রক্ষায় সহায়তা করা এবং যত্রতত্র হৈচৈ ও বিশৃঙ্খলা না করা সকলেরই কর্তব্য।

প্রায় ৩৫ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত পুণ্যতীর্থ রাজবন বিহারে যা কিছু প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং দর্শনীয় স্থান রয়েছে সেগুলো হলো:— 

১। মায়ানমারের প্যাগোডার অনুকরণে সুদৃশ্য “সার্বজনীন উপাসনালয়”—এখানে একটি বৃহদাকারের অষ্টধাতুর বুদ্ধমূর্তি রয়েছে।

২। তৎপাশে দণ্ডায়মান বুদ্ধমূর্তি স্থাপিত একটি বুদ্ধমন্দির এবং শ্রদ্ধেয় বনভান্তের ব্রোঞ্জ নির্মিত প্রতিমূর্তি স্থাপিত একটি মন্দির।

৩। সার্বজনীন উপাসনালয়ের উত্তর দিকে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য তিনতলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন (গেইট বিল্ডিং নামে পরিচিত) রয়েছে।

৪। তৎপাশে মার-বিজয়ী অর্হৎ উপগুপ্ত মহাস্থবিরের মূর্তি।

৫। শ্রদ্ধেয় বনভান্তের ভোজনালয়।

৬। তিনতলা বিশিষ্ট ভোজনালয়, যেখানে দ্বিতীয় তলায় নিয়মিত আবাসিক ভিক্ষুসংঘ, বৃহৎ ধর্মানুষ্ঠানের সময়ে তৃতীয় তলায় অতিথি ভিক্ষুগণ এবং নিচতলায় শ্রামণগণ আহার গ্রহণ করেন।

৭। দ্বিতল বিশিষ্ট মূল বিহার ভবন। এখানেও একটি বৃহৎ আকারের অষ্টধাতুর বুদ্ধমূর্তি রয়েছে।

৮। পরম শ্রদ্ধেয় বনভান্তের জন্য একটি সুদৃশ্য দ্বিতল বিশিষ্ট “সাধনা কুঠির” বা আবাসিক ভবন (১৯৯৩ সালে স্থাপিত)।

৯। “সাধনা কুঠির”-এর পাশে বনভান্তের জন্য নবনির্মিত (২০০৮ সালে স্থাপিত) আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি বৃহৎ ভবন। দক্ষিণ দিকে ভবনটি দোতলা হলেও উত্তর দিক থেকে এটি চারতলার সমান। ভবনটির দোতলা পূজ্য বনভান্তের বিশ্রাম ও দেশনার জন্য হলরুম হিসেবে ব্যবহৃত হলেও গ্রাউন্ড ফ্লোরে “বনভান্তে মেমোরিয়াল হল” নামে বনভান্তের ব্যবহৃত ও স্মৃতি বিজড়িত জিনিসপত্র নিয়ে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। 

১০। শ্রদ্ধেয় বনভান্তের চংক্রমণ ঘর।

১১। আকর্ষণীয় ডিজাইনের সুবৃহৎ দেশনালয়। এখানে একসাথে প্রায় ২০০০ লোক ধর্মদেশনা শ্রবণ করতে পারবেন।

১২। ২টি পাথর।

১৩। বোধিবৃক্ষ দ্বয়।

১৪। সপ্ততল বিশিষ্ট “স্বর্গঘর”।

১৫। বেইন ঘর।

১৬। রাজবন বিশ্বশান্তি প্যাগোডা।

এছাড়াও আরও বিভিন্ন স্থাপত্য নিদর্শন রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, চারদিকের সবুজ শ্যামল গাছ-গাছালি এবং পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকের শান্ত হ্রদ রাজবন বিহারকে প্রকৃতির নৈসর্গিক সজ্জায় শোভিত করে গম্ভীর, নিরিবিলি, আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় করে তুলেছে।

⚠️ দর্শনার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

রাজবন বিহার একটি অত্যন্ত পবিত্র বৌদ্ধ বিহার। এখানে দর্শনের সময় প্রত্যেকের নিচের নিয়মগুলো বিশেষভাবে মেনে চলার অনুরোধ করা হলো:

  • জুতো খোলার নিয়ম : বিহারের মূল কমপ্লেক্স বা মূল মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশের আগে আপনার জুতা-স্যান্ডেল অবশ্যই নির্ধারিত নির্দিষ্ট স্থানে নিজ দায়িত্বে খুলে রাখুন।
  • নীরবতা বজায় রাখা : বিহারের মূল কমপ্লেক্স বা মূল মন্দির প্রাঙ্গণে উচ্চস্বরে কথা বলা বা হইচই করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা কার্যক্রম চলাকালেও নীরবতা বজায় রাখুন।
  • ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখুন : রাজবন বিহার কোনো সাধারণ বিনোদন কেন্দ্র বা পর্যটন স্পট নয়, এটি একটি পবিত্র ধর্মীয় স্থান, বৌদ্ধ বিহার। তাই এখানে প্রবেশের সময় অবশ্যই ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখুন এবং মার্জিত ও শালীন পোশাক পরিধান করুন।
  • ছবি ও ভিডিও ধারণে সতর্কতা : মূল বিহারের কিছু নির্দিষ্ট স্থানে ছবি তোলা বা ভিডিও করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; সেসব জায়গায় সাইনবোর্ড দেওয়া আছে। এছাড়া অন্যান্য স্থানে ছবি তোলা বা ভিডিও করার ক্ষেত্রেও শালীনতা বজায় রাখুন।
  • পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা : যেখানে-সেখানে কেক-বিস্কুট-চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল অথবা যেকোনো ময়লা-আবর্জনা ফেলবেন না। বিহারের চারপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ব্যবহার করুন।
  • ভ্রমণের সঠিক সময় নির্বাচন : প্রতি বছর “কঠিন চীবর দান”-এর সময়ে রাজবন বিহারে লক্ষাধিক ভক্ত-পুণ্যার্থী সমাগম ঘটে। এছাড়া অন্যান্য বিশেষ ধর্মানুষ্ঠানের দিনগুলোতেও প্রচুর পুণ্যার্থী অংশগ্রহণ করে। তাই আপনি যদি শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে রাজবন বিহারের সৌন্দর্য উপভোগ ও দর্শন করতে চান, তবে বিশেষ ধর্মানুষ্ঠানের দিনগুলো বাদে অন্য যেকোনো সময়ে আসার পরিকল্পনা করুন।