বনভান্তের দেশনা: আমি এতদঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের উন্নতি সাধন করতে চাচ্ছি

বনভান্তের দেশনা, বনভান্তের ধর্মদেশনা, বনভান্তের ধর্ম দেশনা, বনভন্তের উপদেশ বাণী, Banabhante Dharma Deshana, Banabhante Desona, Bana Bhante Deshana

একসময় পরম পূজ্য অর্হৎ বনভন্তে স্বীয় আবাসিক ভবনে সমবেত ভিক্ষুসঙ্ঘকে ধর্মদেশনায় বলেন, আমি দেখছি যে এখানে তোমরা (ভিক্ষুদেরকে নির্দেশ করে) বৌদ্ধধর্ম আচরণ ও রক্ষা করতে পারবে কি, পারবে না? বর্তমানে ত্রিশজন বিএ পাস চাকমা ছেলে আমার কাছে ভিক্ষু হয়েছে। চাকমাদের মধ্যে শিক্ষিতরা সহজে প্রব্রজিত হয় না। মারমা হতে একজন এমএ পাস প্রব্রজিত হয়েছে—ব্রহ্মদত্ত ভিক্ষু। বড়ুয়া হতে একজন এমএ পাস এসেছে। বিএ পাসও এসেছে বেশ কয়েকজন।

আগে অন্যরা অবজ্ঞা করতো এই বলে যে, ‘বনভন্তের নিকট শিক্ষিতরা প্রব্রজিত হয় না।’ বর্তমানে তারা আর অবজ্ঞা করতে পারবে না। আমার এখানে যারা এসেছে, তারা গৃহী অবস্থায় বিএ, এমএ পাস করেছে, ভিক্ষু অবস্থায় বিএ, এমএ পাস করেনি। আমি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছি। হঠাৎ যদি পরিনির্বাপিত হই, তাহলে যুবতীরা তোমাদের বলতে পারে, ‘বনভন্তে তো পরিনির্বাপিত হয়েছেন। চল, আমরা স্বামী-স্ত্রী হই!’ তেমনটা হলে তো এখানে বৌদ্ধধর্ম টিকে থাকবে না, রক্ষা হবে না। আমি পুরো ত্রিপিটক সংগ্রহ করেছি। এই ত্রিপিটক চাকমারা আগে দেখেনি। তাদের বাপ-দাদারা দেখেনি, দেখে যাবার সুযোগও হয়নি। আমিও আগে দেখিনি। এবারই পুরো ত্রিপিটক দেখলাম। তোমাদেরও দেখার সুযোগ হলো। এখানে আগে পুরো ত্রিপিটক ছিল না। রাজগুরু অগ্রবংশ ভান্তেও পুরো ত্রিপিটক সংগ্রহ করে যেতে পারেননি। আমি পুরো ত্রিপিটক সংগ্রহ করে রেখেছি রাজবন বিহারে। বর্তমানে যারা শিক্ষিত প্রব্রজিত রয়েছে তারা এই ত্রিপিটক পড়ে দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারবে, নির্বাণ লাভ করতে পারবে, এমনকি আমার অবর্তমানেও। এই পুরো ত্রিপিটক বড়ুয়া ভিক্ষুদের কাছে নেই, মারমা ভিক্ষুদের কাছেও নেই, পার্বত্য ভিক্ষুসঙ্ঘের কাছেও নেই। রাজবন বিহারে যতগুলো ধর্মীয় বই রয়েছে বাংলাদেশের কোনো বিহারে এতো বই নেই। আমি খুবই আগ্রহভরে পুরো ত্রিপিটক সংগ্রহ করেছি। বর্তমানে আমার মনে বার বার প্রশ্ন জাগে, আমার অবর্তমানে তোমরা প্রব্রজ্যা নিয়ে থাকতে পারবে কি? রাজবন বিহার সুরক্ষিত হবে কি?

প্রজ্ঞাবংশ বলেছে, “ভান্তে, আপনার কাছে যদি বেশি বেশি শিক্ষিত ছেলে প্রব্রজ্যা নিত, তাহলে আপনি বুদ্ধশাসনের উন্নতির জন্য আরো কাজ করতে পারতেন। এতদঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের আরো উন্নতি হতো।” বাস্তবিকই নিরক্ষরেরা প্রব্রজিত হলে বৌদ্ধধর্মের উন্নতিতে তেমনভাবে ভূমিকা রাখতে পারে না। বর্তমানে ভগবান বুদ্ধ জীবিত নেই; তাঁর ধর্মোপদেশসমূহ ত্রিপিটকে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেই ত্রিপিটক খণ্ডগুলো সবই ইংরেজীতে, পালিতে। বাংলায় পিটকীয় বই নেই তেমন। সুতরাং ত্রিপিটক পড়ে বুঝতে হলে এমএ, ডবল এমএ, ডক্টরেট ডিগ্রীধারী লাগবে। অশিক্ষিতদের পক্ষে এসব বই পড়া সম্ভব নয়, বুঝা সম্ভব নয়। আমি পুরো ত্রিপিটক রাজবন বিহারে সংগ্রহ করে দিলাম। এখন তোমরা এগুলো পড়ে তদনুরূপ আচরণ করলে দুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারবে, নির্বাণ লাভ করতে পারবে। এতদঞ্চলে বৌদ্ধধর্মকে টিকিয়ে রাখতে পারবে, বৌদ্ধধর্মের উন্নতি সাধন করতে পারবে, এমনকি আমার অবর্তমানেও।

বর্তমানে আমি পুরো ত্রিপিটক শাস্ত্র বাংলায় অনুবাদ করার উদ্যোগ নিয়েছি। প্রজ্ঞাবংশকে পারাজিকা অট্‌ঠকথা অনুবাদ করতে বলেছি। ইতোমধ্যে সে বেশ কয়েকটা অনুবাদ করেছে। আরো অনুবাদ করতে বলবো। সে আমাকে বলেছিল, “আমার সাহায্যকারী যদি ৭/৮ জন থাকতো, তাহলে অনুবাদের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হতো। আমি একা কয়টা অনুবাদ করতে পারব!” সম্প্রতি সে বিনয়পিটকের “পরিবারপাঠো” অনুবাদ শেষ করে আমাকে দিলে সেটা রাজবন বিহার থেকে ছাপানো হয়েছে। মেয়েরা বলছে, তারা সেটা আবার তিন হাজার কপি ছাপিয়ে দিবে। পরিবার পাঠো বাংলায় অনুবাদ হওয়ার মাধ্যমে বিনয়পিটক পুরোটাই বাংলায় অনুবাদ হয়ে গেল। এভাবে পুরো ত্রিপিটককে বাংলায় অনুবাদ করিয়ে নিতে চাচ্ছি আমি। ভিক্ষুণীদের বিনয় সম্পর্কীয় বইও বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। শিক্ষিত মেয়েদেরকে সে বই বিতরণও করেছি। অনেক চাকমা, বড়ুয়া, মারমা মেয়ে বই নিয়ে গেছে, পড়েও ফেলেছে। আর আমাকে বলেছে, “ভন্তে, এই বিষয়গুলো বেশ কঠিন। আচরণ করা সহজ হবে না।” অনেক মেয়ে প্রব্রজিত হতে চাচ্ছে। বড়ুয়া মেয়েরাও চাচ্ছে, চাকমা মেয়েরাও চাচ্ছে। তারা সবাই শিক্ষিতবিএ পাশ, এমএ পাশ। আমি তাদেরকে বলেছি, “না, আমি এখন তোমাদেরকে প্রব্রজ্যা দিব না। আন্দাজে প্রব্রজ্যা দিতে পারব না।” বর্তমান সময়ে মেয়েদের প্রব্রজ্যা দিতে হলে শিক্ষার ব্যবস্থাসহ অন্যান্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

পরিশেষে তিনি বলেন, আমি চাচ্ছি এতদঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের উন্নতি সাধন করতে। বর্তমানে বহু শিক্ষিত যুবক আমার কাছে ভিক্ষু হয়েছে। অন্যদিকে পুরো ত্রিপিটকও সংগ্রহ করেছি। বেশ কয়েকটি ত্রিপিটক খণ্ড বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঁচ খণ্ড বিনয় পুরোটাই বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাবংশসে তো ডবল এম.এ পাস এবং শ্রীলংকায় গিয়ে পালি শিক্ষা করেছে। বর্তমানে সে আমার শিষ্যদেরকে পালি শিখাচ্ছে। কয়েকজন পালি শিক্ষা সমাপ্ত করে ত্রিপিটক অনুবাদের কাজেও হাত দিয়েছে। এভাবে আমি সমস্ত ত্রিপিটককে বাংলায় অনুবাদ করিয়ে নিতে চাচ্ছি। ত্রিপিটক না পড়লে আন্দাজে বৌদ্ধধর্ম আচরণ করা যাবে না। বৌদ্ধধর্ম আচরণ করতে হলে ত্রিপিটক পড়তে হবে। আর চাকমা, বড়ুয়া, মারমা সকল উপাসক-উপাসিকাদেরকে বলছি, তোমরা বাংলায় অনূদিত সেই বইগুলো ছাপিয়ে দাও। প্রতিটি বই কমপক্ষে তিন হাজার কপি ছাপাতে হবে। তবেই সংকুলান হবে। প্রব্রজ্যা জীবনের প্রথমদিকে এই ত্রিপিটক অনেক খুঁজেও পাইনি। এতো বছর পরে ত্রিপিটক সংগ্রহ করতে সমর্থ হলাম। যেগুলো বেশি প্রয়োজনীয় সেগুলোই প্রথমে অনুবাদ করার নির্দেশ দিচ্ছি। ত্রিপিটক বইগুলো না থাকলে বৌদ্ধধর্ম আচরণ করা যাবে না। বৌদ্ধধর্মের উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি সাধন করা সম্ভব হবে না।

আমি চাচ্ছি, বৌদ্ধধর্মের উন্নতি সাধন করতে। কিন্তু তোমরা তো পারছ না; প্রব্রজ্যা ত্যাগ করে চলে যাচ্ছ। তাই আমি বলছি, তোমরা বিয়ে করবে না, সংসারী হবে না, মেয়ে ধরবে না। এই ব্যাপারে প্রব্রজিতদের সতর্ক হওয়া উচিত। বর্তমান ভিক্ষুরা তো চীবর ত্যাগ করে বিয়ে করছে। এভাবে চলতে থাকলে ভিক্ষু থাকবে কি? সবাই তো গৃহী হয়ে যাবে। মাঝে মাঝে এরূপ ঘটনা ঘটেমেয়েরা সিয়ং দিতে বিহারে যায়। কিছুদিন যেতে না যেতে সেই বিহারের ভিক্ষুর সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে সংসার করা শুরু করে। মনে রাখবে, যেই ভিক্ষু জ্ঞানী, বৌদ্ধধর্ম বুঝে, সে কিছুতেই বিয়ে করবে না। বর্তমানে আমি সবাইকে বলছি, ‘বৌদ্ধধর্মকে উজ্জ্বল করতে যত্নশীল হও।’ বৌদ্ধধর্মকে উজ্জ্বল করতে আমি ত্রিপিটকের খণ্ডগুলো ছাপিয়ে নিচ্ছি। আমার দেশনা শুনে চাকমারা অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে চাকমাদের মধ্যে অনেকে ‘হরে কৃষ্ণ, হরে বোল’ বলতো। আমি গৃহী অবস্থায় নিজে দেখেছি সেরূপ ঘটনা। এখন আর সেরূপ বলে না। দেখছ তো, বনভন্তে চাকমাদেরকে পরিবর্তন করিয়েছে! মোটামুটি এখন সবাই বৌদ্ধধর্মকে বিশ্বাস করছে, মানছে। সেই ধারাকে আরো গতিশীল করতে আমি চাচ্ছি শিক্ষিত শিষ্য গড়ে তুলতে। তোমাদেরকে ত্রিপিটকীয় বইগুলো পড়তে হবে। যথাযথভাবে শীল পালন করবে। তোমাদের উন্নতি হোক, শ্রীবৃদ্ধি হোক। এই বলে দেশনা সমাপ্ত করলাম।

أحدث أقدم