রাজবন বিহারের ইতিহাস

তখন ১৯৭০ সাল। লংগদু থানার তিনটিলা মৌজার তৎকালীন হেডম্যান ও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অনিল বিহারী চাকমা, গঙ্গাধন চাকমা (বুড়াচোগী বাপ, ক্যাংঠাগা নামে সুপরিচিত), প্রতুল বিকাশ চাকমা (নিরোধ), সত্যব্রত চাকমা, নিশিচন্দ্র চাকমা, শচীনাথ চাকমা, বীরসেন চাকমা প্রমুখ ব্যক্তিগণ পরম পূজ্য বনভান্তেকে দানোত্তম কঠিন চীবর দানসহ তিনটিলা বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি তাঁদের সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। পূজ্য বনভান্তে লংগদুতে ১৯৭০ সালের শেষ দিক হতে ১৯৭৭ সালের বৈশাখী পূর্ণিমার আগ পর্যন্ত অবস্থান করেছিলেন।

১৯৭৪ সালে পূজ্য বনভান্তে রাঙ্গামাটির রাজ বিহারে কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন। সেই সময়ে রাজপরিবারবর্গ ও রাঙ্গামাটির বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের বিনীত প্রার্থনা ও আমন্ত্রণে পূজ্য বনভান্তে রাঙ্গামটিতে অবস্থান করার সম্মতি জ্ঞাপন করেছিলেন। কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানের পর তিনি তিনটিলায় ফিরে গেলেও তাঁর উপদেশ অনুযায়ী অস্থায়ী কুটির সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণের মাধ্যমে (বর্তমান রাজবন বিহার এলাকায়) স্থায়ী বিহার নির্মাণকল্পে কয়েকজন স্থানীয় ধর্মানুরাগী শ্রদ্ধাবান দায়ক উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসেন। বিহার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ১৯৭৪ সালে ডা. হিমাংশু বিমল দেওয়ানকে সভাপতি এবং বাবু তুষ্ঠমনি চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে বিভিন্ন এলাকার ধর্মানুরাগী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি অস্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি ১৯৭৪ সালে হতে ১৯৭৫ সালের ৭ জুন পর্যন্ত বিহারের কার্যক্রম পরিচালনা করে। তৎপর ১৯৭৫ সালের ৮ জুন ডা. হিমাংশু বিমল দেওয়ানকে সভাপতি এবং বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানকে সাধারণ সম্পাদক মনোনয়ন করে প্রথম পূর্ণাঙ্গ রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়, যার কার্যকাল ছিল ১৯৭৬ সালের ২২ মে পর্যন্ত। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের ৮ জুন চাকমারাণী আরতি রায়কে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয় এবং পূর্ববর্তী কমিটির মেয়াদ শেষ হলে পুনরায় ডা. হিমাংশু বিমল দেওয়ানকে সভাপতি এবং বঙ্কিম চন্দ্র দেওয়ানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়, যার মেয়াদকাল ২৩ মে ১৯৭৬ হতে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮১ পর্যন্ত ছিল। এরই মাঝে রাজবন বিহারের গুরুত্ব, প্রসার ও কার্যক্রম বিভিন্নভাবে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিহারের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলরূপে পরিচালনা, উন্নতি, প্রচার, প্রসার ও পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য চাকমারাজা দেবাশীষ রায়ের অনুপ্রেরণায় ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে একটি বিধিমালা প্রণয়ন করে অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৮১ সালের ২৭ ডিসেম্বর সাধারণ সভার মাধ্যমে চাকমারাজা দেবশীষ রায়কে প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং রাজমাতা আরতি রায়কে পৃষ্ঠপোষক নির্ধারণ করা হয়। সেই সাথে উপরোক্ত বিধিমালা মোতাবেক ১ জানুয়ারী ১৯৮১ হতে ২৬ এপ্রিল ১৯৮৪ কার্য মেয়াদে তৃতীয় পূর্ণাঙ্গ বিহার পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। রাজবন বিহার প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পর্যন্ত বহু বার বিহার পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। উল্লেখ্য, পূজ্য বনভান্তে ১৯৯৯ সালে “রাজবন বিহার পরিচালনা কমিটি”-এর নাম পরিবর্তন করে “রাজবন বিহার উপাসক-উপাসিকা পরিষদ” নামকরণ করতে বলেন এবং অদ্যাবধি সেই নামেই তা উক্ত হচ্ছে।

১৯৭৪ সালে পূজ্য বনভান্তে রাঙ্গামাটির রাজ বিহারে কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানে এসে রাজপরিবারবর্গ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের প্রার্থনা ও আমন্ত্রণে রাঙ্গামটিতে অবস্থান করার সম্মতি জানালেও কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানের পর তিনি তিনটিলায় ফিরে যান। ১৯৭৬ সালে তিনি রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে প্রথম বর্ষাবাস যাপন করেন। সেই সময়ে তাঁর সঙ্গে শ্রীমৎ নন্দপাল ভিক্ষু, শ্রীমৎ অতুল সেন ভিক্ষু, শ্রীমান অনিরুদ্ধ শ্রামণের, শ্রীমান বনশ্রী শ্রামণের ও শ্রীমান আনন্দ পাল শ্রামণের বর্ষাবাস যাপন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথির প্রাক্কালে তাঁর শিষ্যবর্গসহ লংগদুর তিনটিলা বন বিহার হতে রাঙ্গামাটির রাজবন বিহারে স্থানান্তরিত হয়ে স্থায়ীভাবে অবস্থান করেন। এরপর ১৯৯৯ সাল (খাগড়াছড়ির ধর্মপুর আর্যবন বিহারে বর্ষাবাস যাপন করেছিলেন) ব্যতীত ২০১২ সালের ৩০ জানুয়ারি পরিনির্বাণ লাভ করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি রাজবন বিহারেই অবস্থান করেছিলেন।

শ্রদ্ধেয় বনভন্তে রাজবন বিহারে স্থায়ীভাবে বাস করার পর থেকে রাঙ্গামাটিবাসী ও অন্যান্যদের পুণ্য সঞ্চয় করার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং তাঁকে একনজর দর্শন করার অভিলাষে দূর-দূরান্ত হতে রাজবন বিহারে জনস্রোত বইতে থাকে। ১৯৭৪ সালে রাজবন বিহার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ধাপে ধাপে উন্নয়নের ফলে বর্তমান পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বিশেষত সদ্ধর্মপ্রাণ দায়ক-দায়িকাদের শ্রদ্ধাদানের ওপর নির্ভর করে এসব উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্যদের বিভিন্ন সহায়তার ফলে রাজবন বিহারের এই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বেগবান হয়েছে। বর্তমানে রাজবন বিহারে যে-সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে, তন্মধ্যে ১৯৮৭ সালে সার্বজনীন উপাসনালয়, ১৯৮৮ সালে বনভন্তের ভোজনালয়, ১৯৯৩ সালে বনভন্তের সাধনা কুটির, ১৯৯৪ সালে বনভন্তের চংক্রমণ ঘর, ১৯৯৬ সালে থাই বুদ্ধমূর্তি স্থাপিত একটি বুদ্ধমন্দির এবং বনভন্তের ব্রোঞ্জ নির্মিত প্রতিমূর্তি স্থাপিত একটি মন্দির, ১৯৯৭ সালে দ্বিতল ভোজনাশালা, ১৯৯৯ সালে উপগুপ্ত বুদ্ধের মূর্তি, ১৯৯৯-২০০০ সালে অতিথিশালা, ২০০০ সালে রাজবন হাসপাতাল, ২০০২ সালে সপ্ততল বিশিষ্ট স্বর্গঘর, ২০০৩ সালে দেশনালয়, ২০০৪ সালে ভিক্ষুদের জন্য “সারিপুত্র ভবন” নামে তিনতলা আবাসিক ভবন, ২০০৮ সালে বনভন্তের জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট আবাসিক ভবন, ১৯৮১ সালে নির্মিত পাকা ভিক্ষুসীমা ভেঙ্গে ২০০৮ সালে একটি বৃহৎ পাকা ভিক্ষুসীমা, এবং ২০২০ সালে ভিক্ষুদের জন্য “মোদ্গল্লায়ন ভবন” নামে তিনতলা আবাসিক ভবন নির্মিত হয়।